বাঙ্গালী
Thursday 30th of March 2017
code: 80493
হযরত আলীর (আ.) খেলাফতের অকাট্য প্রমাণসসমূহ



দশম হিজরীতে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)এর আহবানে সাড়া দিয়ে লাখো মুসলমান মক্কায় হজ্বব্রত পালন করতে যান। মদিনায় হিজরতের পর এটিই ছিল রাসূলের প্রথম হজ্ব। শুধু প্রথম নয়, তাঁর শেষ হজ্বও এটি। ওই হজ্বের কিছু দিন পরই বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সা.) ইন্তেকাল করেন। মক্কার পথে রাসূলেখোদা (সা.)-র সফরসঙ্গী হওয়ার জন্য বিপুল সংখ্যক মুসলমান মদিনায় জড়ো হন। রাসূলের এ হজ্বকে নানা নামে অভিহিত করা হয়। এর মধ্যে হুজ্জাতুল বিদা, হুজ্জাতুল ইসলাম, হুজ্জাতুল বালাগ, হুজ্জাতুল কামাল ও হুজ্জাতুত তামাম অন্যতম।

মহানবী(সা.) ২৪ অথবা ২৫ শে জ্বিলকাদ শনিবার হজ্বব্রত পালনের উদ্দেশ্যে মদিনা থেকে পায়ে হেঁটে মক্কার পথে রওনা হন। ১৮ই জ্বিলহজ্ব বৃহস্পতিবার হজ্ব শেষে মদিনায় ফেরার পথে রাসূল (সা.) যখন জুহফা'র কাছাকাছি গাদীরে খুম নামক স্থানে পৌঁছান, ঠিক তখনি রাসূলের কাছে ওহি নাজিল হয়। জিব্রাইল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

يَا أَيُّهَا الرَّ‌سُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّ‌بِّكَ ۖ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِ‌سَالَتَهُ

‘হে রাসূল ! তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা তুমি সবার কাছে পৌঁছে দাও, যদি তা না কর তাহলে তো তুমি তার বার্তা প্রচার করলে না ।' (সূরা মায়েদা: আয়াত ৬৭)

রাসূলে খোদা (সা.) আল্লাহর নির্দেশ পাওয়ার পর তিনি সবাইকে সমবেত হতে বললেন। চলার পথে যারা কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিলেন তারা পেছনে ফিরে আসেন। আর যারা পেছনে ছিলেন তারা এগিয়ে এসে ওই স্থানে থেমে যান। রৌদ্রস্নাত উত্তপ্ত মরু হাওয়ায় সবাই তখন ক্লান্ত অবসন্ন । তারপরও সবাই খুবই মনোযোগ সহকারে অপেক্ষা করতে লাগলেন রাসূলের বক্তব্য শুনার জন্য। তারা বুঝতে পারলেন, রাসূল (সা.) মুসলমানদের জন্যে নতুন কোনো বিধান বা দিক নির্দেশনা দেবেন ।

ওই স্থানে পাঁচটি পুরনো গাছ ছিল। রাসূলের নির্দেশে গাছের নিচের জায়গাটুকু পরিস্কার করা হলো। এরপর সাহাবিরা সেখানে চাদোয়া টানিয়ে দিলেন। জোহরের আজান দেয়ার পর মহানবী সবাইকে নিয়ে সেখানে নামাজ আদায় করলেন। এরপর উটের জিনকে মঞ্চের মত করে তাতে আরোহণ করলেন এবং সমবেত সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'সমস্ত প্রশংসা একমাত্র মহান আল্লাহ রাব্বুর আলামিনের। আমরা তারই সাহায্য চাই ও তার ওপরই ঈমান এনেছি। তার ওপরই আমাদের ভরসা। কেবল তিনিই বিভ্রান্তদেরকে সৎ পথে পরিচালনা করার ক্ষমতা রাখেন। আর আল্লাহ যাকে দিকনির্দেশনা দেন, তিনি যেন বিভ্রান্তকারীতে পরিণত না হন। আমি এ সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি ছাড়া আর কেউ উপাসনার যোগ্য নয় এবং মুহাম্মদ হচ্ছে তার বান্দা ও প্রতিনিধি। দয়াময় ও মহাজ্ঞানী আল্লাহই আমাকে এ সংবাদ দিয়েছেন যে, আমার ইহকালীন জীবনের মেয়াদ শেষ হয়ে এসেছে, অচিরেই আমার জীবনের অবসান ঘটবে, মহান সৃষ্টিকর্তার ডাকে সাড়া দিয়ে এ জগত ছেড়ে চলে যেতে হবে আমাকে। আমার ও আপনাদের ওপর যেসব বিষয় অর্পিত হয়েছে, সেসব বিষয়ে আমরা সবাই দায়িত্বশীল। আপনাদের কি অভিমত?'

এ সময় সবাই উচ্চস্বরে বলে ওঠেন, 'আমরা এ সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, বার্তা পৌঁছে দেয়া, কল্যাণকামিতা তথা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আপনি কোনো ধরনের অবহেলা করেননি। আল্লাহ আপনাকে পুরস্কৃত করবেন।'

এ সময় রাসূল (সা.) বলেন, 'আপনারা কি এ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে-আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, মুহাম্মদ তাঁর বান্দা ও রাসূল এবং বেহেশত, দোজখ, মৃত্যু ও কিয়ামতের বিষয়ে কারো কোনো সন্দেহ নেই। এ ছাড়া, আল্লাহ মৃতদেরকে পুণরায় জীবিত করবেন?'

উত্তরে সবাই সমস্বরে বলেন-'হ্যা আমরা এ সত্যের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিচ্ছি।' এরপর রাসূল (সা.) সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে বলেন, 'হে আল্লাহ আপনিতো দেখতেই পাচ্ছেন।'

এরপর রাসূল (সা.) বলেন, 'আমি আপনাদের আগে হাউজে কাউসারে প্রবেশ করবো। এরপর আপনারা সেখানে প্রবেশ করবেন এবং আমার পাশে অবস্থান নেবেন। সানা ও বসরার মধ্যে যে দূরত্ব,আমার হাউজে কাউসের প্রশস্ত হবে সে পরিমাণ। সেখানে থাকবে তারকারাজি এবং রুপার পাত্র।'

এরপর বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সবার উদ্দেশে বলেন, 'মূল্যবান ও সম্মানিত যে দুটি জিনিস আপনাদের কাছে রেখে যাচ্ছি, আপনারা কীভাবে তা মেনে চলেন, তা আমি দেখতে চাই।' এ সময় সবাই সমস্বরে বলে ওঠেন, 'হে রাসূলুল্লাহ, ওই দু'টি মূল্যবান ও সম্মানিত জিনিস কী?'

রাসূল (সা.) বললেন, আমি তোমাদের জন্য অতি মূল্যবান দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি। একটি হচ্ছে আল্লাহর কিতাব আল কুরআন আর অপরটি হচ্ছে আমার পবিত্র আহলে বাইত। যদি তোমরা এ দুটোকে শক্ত করে আকড়ে ধর তবে কখনোই পথ ভ্রষ্ট হবে না। এ হাদিসটি সামান্য শব্দের তারতম্যভেদে বিভিন্ন বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হচ্ছে- সহিহ মুসলিম, ৭ম খণ্ড, পৃ:-১২২, দারুল যিল, বৈরুত; সহিহ তিরমিযি, ৫ম খণ্ড, পৃ:-৬৬৩, বৈরুত; মুসনাদে আহমাদ, ৩য় খণ্ড, পৃ:-১৪, বৈরুত; কানযুল উম্মাল, ১ম খণ্ড, পৃ:-১৮৭; মুসতাদরাকে হাকেম, ৩য় খণ্ড, পৃ:-১৪৮, বৈরুত।

এরপর আল্লাহর রাসূল (সা.) আলী (আ.)এর হাত উত্তোলন করেন। এ সময় তাদের বগলের নিচ থেকে এক ঝলক শুভ্রতা ফুটে ওঠে এবং সবাই তা দেখতে পায়। এরপর রাসূল (সা.) বলেন, “মহান আল্লাহ হচ্ছেন আমার ওলি এবং রক্ষণাবেক্ষণকারী । আমি হচ্ছি মুমিন-বিশ্বাসীদের ওলি ও অভিভাবক,আর আমি যার নেতা ও অভিভাবক, আলীও তার নেতা ও অভিভাবক।' এরপর তিনি দোয়া করেন। রাসূল (সা.) বলেন, 'হে আল্লাহ ! যে আলীকে বন্ধু মনে করে তুমি তাকে দয়া ও অনুগ্রহ করো, আর যে আলীর সাথে শত্রুতা করে, তুমি তার প্রতি একই মনোভাব পোষণ করো।”

বিশ্বনবী এসব বার্তা অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতে উপস্থিত সবার প্রতি নির্দেশ দেন। তখনও সমবেত হাজীরা ওই স্থান ত্যাগ করেননি। এরই মধ্যে হযরত জিব্রাঈল (আ.) আল্লাহর বাণী অবতির্ণ হলেন, মহান রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন:-

'আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন বা জীবন বিধান হিসেবে মনোনীত করলাম।' ( সূরা মায়েদা; আয়াত-৩)

এই হাদীসটি বিভিন্ন তাফসীরকারক ও মুফাসসীরগণ তাদের নিজ নিজ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্য কিছু গ্রন্থের নাম এখানে উল্লেখ করা হল। সহিহ মুসলিম, ২য় খণ্ড, পৃ:-৩৬২; সহিহ তিরমিযি, হাদীস নং:-৪০৭৮; মুসনাদে আহমাদ, ২য়  খণ্ড, পৃ:-৪১২; সুনানে ইবনে মাজা, ১ম খণ্ড, পৃ:-৪৫; মুসতাদরাকে হাকেম, ৩য় খণ্ড, পৃ:-১১৮; তারিখে ইয়াকুবী, ২য় খণ্ড, পৃ:-৪৩; তারিখে তাবারী, ২য় খণ্ড, পৃ:-৪২৯; সুনানে নাসাই, ৫ম খণ্ড, পৃ:-১৩২; আল মুসনাদ আল-জামে, ৩য় খণ্ড, পৃ:-৯২; আল মুজাম আল-কাবির, ৪র্থ খণ্ড, পৃ:-১৬; কানজুল উম্মাল, ১৩ তম খণ্ড, পৃ:-১৬৯; তারিখে দামেশক, ২য় খণ্ড, পৃ:-৪৫।

আয়াতটি নাজিল হওয়ার পর রাসূল (সা.)বলেন, 'আল্লাহু আকবার। তিনি ধর্মকে পূর্ণাঙ্গ করেছেন, অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করেছেন এবং আমার রেসালাত ও আমার পরে আলীর নেতৃত্বের ওপর আল্লাহ সন্তুষ্ট।' এর পরপরই সবাই আলী(আ.)-কে অভিনন্দন জানাতে থাকেন।

সবার আগে আবু বকর ও ওমর  এগিয়ে এসে বললেন, 'হে আবি তালিবের সন্তান, তোমাকে অভিনন্দন। আজ তোমার ওপর দায়িত্ব এসেছে। তুমি আমাদের এমনকি সব নারী ও পুরুষের অভিভাবক।'

শুধুমাত্র গাদীরই প্রথম পদক্ষেপ নয় যে, রাসূল (সা.) তার প্রতিনিধিকে জনগণের সামনে পরিচয় করিয়েছেন। তিনি বহুবার অনেক অনুষ্ঠানে তার ভাষণে বিভিন্নভাবে এই সত্যতার কথা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন এবং তাকে পরবর্তী নেতা হিসেবে পরিচয় করিয়েছেন। যারা তার নিকট আসা- যাওয়া করত তারা এই ইসলামী রাষ্ট্রের উল্লিখিত ঘটনা থেকে বেখবর ছিল না, তারা জানতেন যে, আলী (আ.) রাসূল (সা.)-এর ঠিক পরবর্তী খলিফা ও তার সর্বাপেক্ষা প্রিয় এবং সবার চেয়ে নিকটবর্তী সাহাবী।

খেলাফতের বিষয়টি এমন ছিল না যে, দশম হিজরী পর্যন্ত নিরব নিস্তব্ধ ছিল। রাসূল (সা.)-এর খলিফা বা প্রতিনিধি সেদিনই নির্ধারিত হয়েছে যেদিন মক্কাতে ইসলাম আত্মপ্রকাশ করেছে।

গাদীরের হাদীস ছাড়াও অন্য যে সকল প্রমাণাদি সরাসরি সুস্পষ্টভাবে আলীর (আ.) খেলাফত ও নেতৃত্বকে প্রমাণ করে তার সংখ্যা এত বেশী যে যদি আমরা তা উল্লেখ করতে চাই তাহলে শুধু সেগুলিই একটা বড় গ্রন্থের রূপলাভ করবে। তাই এখানে সামান্য কয়েকটির উল্লেখ করেই ক্ষান্ত থাকব।

প্রথমেই বলা দরকার যে, যদিও মুসলিম সমাজ রাসূল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর নেতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভ্রান্ত পথে গিয়েছিল ও রাসূল (সা.)-এর প্রকৃত খলিফাকে ২৫ বছর (পচিশঁ বছর) ধরে শাসনকার্য হতে দূরে রেখেছিল, কিন্তু এতে তার সত্ত্বাগত মর্যাদার মূল্য বিন্দু পরিমাণও কমে নি; বরং তারা নিজেরাই একজন নিষ্পাপ বা মাসুম নেতা হতে বঞ্চিত হয়েছে এবং উম্মতকেও বঞ্চিত করেছে। কারণ, তার মান-মর্যাদা বাহ্যিক খেলাফতের সাথে সম্পৃক্ত ছিল না, বরং খেলাফতের পদটি স্বয়ং আলীর (আ.) দায়িত্বভারের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। অর্থাৎ যখনই তিনি ব্যতীত অন্য কেউ এই পদে আসীন হয়েছেন তখনই এই পদ বা আসনটির অধঃপতন ঘটেছে। আর শুধুমাত্র তখনই তা প্রকৃত মর্যাদায় পৌছেছে যখন আলী (আ.) তার উপর সমাসীন হয়েছেন। বর্ণিত হয়েছেঃ

যখন আমিরুল মু’মিনীন আলী (আ.) কুফা শহরে প্রবেশ করলেন, তখন এক ব্যক্তি সামনে এসে বললঃ আল্লাহর কসম হে আমিরুল মু’মিনীন! খেলাফতই আপনার মাধ্যমে সুশোভিত ও সৌন্দর্যমন্ডিত হয়েছে, এমন নয় যে আপনি ঐ খেলাফতের মাধ্যমে। আপনার কারণেই এই পদটি মর্যাদার উচ্চ স্তরে পৌছেছে, এমন নয় যে আপনি ঐ পদের কারণে উচ্চস্তরে পৌছেছেন। খেলাফতই আপনার মুখাপেক্ষী হয়েছিল না আপনি তার পতি।

আহমাদ ইবনে হাম্বালের পুত্র আব্দুল্লাহ বলেছেনঃ একদিন আমার পিতার নিকট বসেছিলাম। কুফার অধিবাসী একদল লোক প্রবেশ করলো ও খলিফাদের খেলাফত সম্পর্কে আলোচনা করলো; কিন্তু আলীর খেলাফত সম্পর্কে কথা-বার্তা একটু দীর্ঘায়িত হল। আমার পিতা মাথা উচু করে বললেনঃ তোমরা আর কত আলী ও তার খেলাফত (শাসনকর্তৃত্ব) সম্পর্কে আলোচনা করতে চাও! খেলাফত আলীকে সুশোভিত করেনি বরং আলীই খেলাফতকে সৌন্দ্রর্য্য দান করেছেন।

১. ইয়াওমদুদার’র হাদীস (প্রথম দাওয়াতের হাদীস)

রাসূল (সা.)-এর খেলাফত ও ইসলামী রাষ্ট্রের নেতৃত্বের বিষয়টি এমন কোন বিষয় ছিল না যে, রাসূল (সা.) তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এটাকে (খেলাফত) অব্যক্ত রাখবেন আর ইসলামী সমাজের দায়িত্ব-কর্তব্যকে ঐ ক্ষেত্রে স্পষ্ট করবেন না। রাসূল (সা.) যেদিন তার রেসালাতের দায়িত্বকে প্রকাশ্যে ঘোষণার নির্দেশ পেয়েছেন, সেদিনই তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন স্বীয় স্থলাভিষিক্তকেও পরিচয় করিয়ে দেওয়ার।

পবিত্র কোরআনের এই আয়াত-

)وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ(

অর্থাৎ “তোমার নিকটাত্মীয়গণকে সতর্ক করে দাও” (সূরা আশ শুয়ারা)

যখন তিনি নবূয়্যতী দায়িত্ব গ্রহণের তৃতীয় বর্ষে পদার্পণ করলেন, আলীকে ডাকলেন ও বললেনঃ “আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমি আমার নিকটাত্মীয়দেরকে ইসলামের দাওয়াত দিই। তুমি কিছু খাবার তৈরী কর ও কিছু দুধ সংগ্রহ কর এবং আব্দুল মোত্তালিবের সন্তান্তানদেরকে দাওয়াত দাও যাতে আমি আমার দায়িত্বটি পালন করতে পারি।” হযরত আলী (আ.) বলেছেনঃ আমি আব্দুল মোত্তালিব বংশের প্রায় চল্লিশজন গণ্য-মান্য ব্যক্তিকে দাওয়াত করলাম ও যে খাবার তৈরী করেছিলাম সেটা সামনে রাখলাম। তারা সে খাবার খেল এবং দুধ পান করল; কিন্তু খাবার ও দুধ ঠিক পূর্বের পরিমাণেই অবশিষ্ট রয়ে গেল। যখন রাসূল (সা.) তাদের সাথে কথা বলতে চাইলেন, আবু লাহাব বললঃ মুহাম্মদ তোমাদেরকে যাদু করেছে, একথা বলে অনুষ্ঠান ভেঙ্গে দিল। পরের দিন তিনি আবার নির্দেশ দিলেন তাদেরকে দাওয়াত দেওয়ার জন্যে এবং খাবার ও দুধ প্রস্তুত করার জন্যে। তাদের খাদ্য গ্রহণ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই রাসূল (সা.) মুখ খুললেন ও বললেনঃ “হে আব্দুল মোত্তালিবের সন্তানগন! আল্লাহর কসম; এই আরবে আমি এমন কোন যুবককে দেখি নি যে, স্বীয় গোত্রের জন্য আমি যা এনেছি তার চেয়ে উত্তম কিছু নিয়ে এসেছে। আমি তোমাদের জন্য ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ নিয়ে এসেছি এবং আমার আল্লাহ বলেছেন যেন আমি তোমাদেরকে সেই পথে আহবান করি। তোমাদের মাঝে কে আছে যে, এই কাজের জন্য আমাকে সাহায্য করবে। আমি (আলী) সে সময় উপস্থিতদের মধ্যে সবার চেয়ে কম বয়সী (তরুন) ছিলাম বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনাকে সাহায্য করব। তিনি আমার ঘাড়ে হাত দিয়ে বললেনঃ তোমাদের মধ্যে এ আমার ভাই, ওসী (দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি) ও খলিফা বা স্থলাভিষিক্ত তার কথা শোন ও তার আনুগত কর। তখন অনুষ্ঠানের সকলেরই উঠে দাড়ালো ও হাসতে হাসতে আবু তালিবকে বললঃ তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছে যে, তুমি তোমার ছেলে আলীর আনুগত কর।”

অপর এক বর্ণনা মতে রাসূল (সা.) তিনবার এই প্রস্তাব পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। কিন্তু প্রত্যেকবার আলী (আ.) ব্যতীত অন্য কেউ তার প্রস্তাবে সম্মতি জানায় নি।

২. মানযিলাত’র হাদীস (পদ মর্যাদার হাদীস)

অপর একটি হাদীস যেটা আলীর (আ.) খেলাফতের পক্ষে প্রমাণ বহন করে তা হচ্ছে মানযিলাতের হাদীস (পদ মর্যাদার হাদীস)। রাসূল (সা.)-এর বর্ণিত হাদীসসমূহের মধ্যে মানযিলাতের হাদীস হচ্ছে রাসূল (সা.)-এর থেকে বর্ণিত প্রসিদ্ধতম হাদীসসমূহের অন্যতম এবং অনেক সাহাবীই এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইবনে আসাকির তার “তারিখে দামেশক” শীর্ষক গ্রন্থে ৩২ জন সাহাবী থেকে এ হাদীসটি সূত্র সহকারে বর্ণনা করেছেন। বর্ণনাধারা এবং পারিপার্শ্বিক প্রমাণসমূহ থেকে বোঝা যায় এই পবিত্র বাণীটি রাসূল (সা.) বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে কয়েকবার ব্যক্ত করেছেন, কিন্তু প্রসিদ্ধতম স্থান হল তাবুকের যুদ্ধের সময়।

তাবুকের যুদ্ধের সময় রাসূল (সা.) স্বয়ং সৈন্যদের নেতৃত্বের দায়িত্বভার কাধে নিয়ে মদীনা হতে বের হলেন ও আলীকে মদীনায় তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে রাখলেন। এটিই একমাত্র যুদ্ধ ছিল যে যুদ্ধে আলী (আ.) রাসূলের (সা.) সাথে ছিলেন না, আর সে কারণেই তার জন্য মদীনায় থাকাটা একটু কঠিন হচ্ছিল। রাসূল (সা.) রণাঙ্গনের পথে যাত্রা শুরু করলেন। সৈন্যদল যখন যাত্রা শুরু করেছে ঠিক তখনই তিনি (আলী) রাসূল (সা.)-এর নিকট গিয়ে বললেনঃ আমাকে আপনি এই শিশু আর নারীদের সাথে মদীনায় রেখে যাচ্ছেন?

তখন রাসূল (সা.) তার উত্তরে বললেনঃ

اما ترضی أن تکون منی بمنزلة هارون من موسی الا انه لا نبی بعدی

আমা তারজা আন তাকুনা মিন্নি বি মানযিলাতি হারুনা মিন মুসা ইল্লা আন্নাহু লা নাবীয়্যা বা’দী।”

অর্থাৎ তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, আমার সাথে তোমার সম্পর্ক ঠিক তেমন যেমনটি মুসার সাথে হারুনের ছিল? শুধু এতটুকু পার্থক্য যে আমার পরে আর নবী আসবে না। পবিত্র কোরআনে এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে হযরত মুসার (আ.) সাথে হযরত হারুনের (আ.) সম্পর্ক ছিল পাচঁ দিক থেকেঃ ১. ভাই, ২. নবুয়্যতের অংশীদার, ৩. উজীর ও সাথী, ৪. সাহায্যকারী, ৫. খলিফা ও স্থলাভিষিক্ত।

সুতরাং হযরত আলীও (আ.) রাসূল (সা.)-এর সাথে এই পাচটি সম্পর্কের অধিকারী: কারণ তাকে ভাই হিসেবে নির্ধারণ করার পর বলেছেনঃ “ইহকাল ও পরকালে তুমিই আমার ভাই, আল্লাহর বাণী পৌছানোর ক্ষেত্রে তার অংশীদার, যেমন বলেছেনঃ আমি এবং আলী ব্যতীত কেউ যেন আমার বাণী প্রচার না করে”। তার উজীর কারণ, তিনি নিজে বলেছেনঃ আলী আমার উজীর। তার সাহায্যকারী যেমনঃ আল্লাহ তাকে আলীর (আ.) দ্বারা সাহায্য করেছেন, ও তার খলিফাঃ কারণ, তিনি স্বয়ং তাকে স্থলাভিষিক্ত হিসেবে নির্বাচন করেছেন।

৩. উত্তরাধিকারের ও প্রতিনিধিত্বের হাদীস

রাসূল (সা.) বলেছেনঃ

لکل نبی وصیّ و وارث و إنّ علیا وصیی و وارثی

অর্থাৎ প্রত্যেক নবীরই ওসী বা প্রতিনিধি ও উত্তরাধিকারী আছে আমার প্রতিনিধি ও উত্তরাধিকারী হল আলী।

আরো বলেনঃ

أنّا نبی هذه الامة و علی وصیی فی عترتی و اهل بیتی و أمتی من بعدی

অর্থাৎ আমি এই উম্মতের (জাতির) নবী আর আলী হচ্ছে আমার পরে আমার পরিবারের ও উম্মতের মধ্যে আমার ওসী বা প্রতিনিধি।

তিনি বলেনঃ

علی أخی و وزیری و وارثی و وصیی و خلیفتی فی أمتی

অর্থাৎ আমার উম্মতের মধ্যে আলীই আমার ভাই, আমার সহযোগি উজীর, উত্তরাধিকারী, প্রতিনিধি ও আমার খলিফা।

এই হাদীসসমূহে ওসী (প্রতিনিধি) ও উত্তরাধিকারী এ দু’টি শিরোনামকে বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আর ঐ দু’টির প্রতকেটিই আমিরুল মু’মিনীন আলীর (আ.) খেলাফতকেই প্রমাণ করে।

ওসী বা প্রতিনিধি

ওসী বা প্রতিনিধি তাকেই বলা হয় যিনি সমস্ত দায়-দায়িত্বের ক্ষেত্রে অসিয়তকারীর অনুরূপ অর্থাৎ যা কিছুর উপর অসিয়তকারীর অধিকার ও ক্ষমতা ছিল ওসীর বা প্রতিনিধিরও তার সবকিছুর উপর অধিকার ও ক্ষমতা রয়েছে এবং তা ব্যবহার করতে পারবেন; শুধুমাত্র ঐ ক্ষেত্র ছাড়া যে ক্ষেত্রে তিনি নির্দিষ্টভাবে তাকে অসিয়ত করবেন যে, এই ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত তার ব্যবহারের অধিকার আছে।

এই হাদীসে রাসূল (সা.) আলীকে (আ.) অসিয়তের ক্ষেত্রে দায়িত্বকে সীমিত করেন নি বরং তাকে নিঃশর্তভাবে ওসী বা প্রতিনিধি নিয়োগ করেছেন; অর্থাৎ তিনি রাসূল (সা.)-এর সকল কাজের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন। অন্যভাবে বলা যায়, রাসূল (সা.)-এর অধীনে যা কিছু আছে তার সবকিছুতে আলীর (আ.) অধিকার আছে আর এটাই হচ্ছে খেলাফতের প্রকৃত অর্থ।

উত্তরাধিকারী

উত্তরাধিকারী শব্দটি শুনে প্রথম যে চিত্রটি মাথায় আসে তা হচ্ছে- উত্তরাধিকারী ব্যক্তি, উত্তরাধিকারী মনোনীতকারীর সমস্ত সম্পত্তির মালিক হয়; কিন্তু আলী (আ.) শরীয়তের দৃষ্টিতে রাসূল (সা.)-এর সম্পদের উত্তরাধিকারী ছিলেন না। কেননা, ইমামিয়া ফিকাহ্ শাস্ত্রের আইন অনুযায়ী মৃতের যখন কোন সন্তান থাকে, তখন অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন সম্পদের উত্তরাধিকারী হয় না (সন্তানগণ সম্পদের প্রথম পর্যায়ের উত্তরাধিকারী, তারপর অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন) আর আমরা জানি যে, রাসূল (সা.) তার জীবদ্দশায় সন্তান রেখে গিয়েছিলেন। ফাতিমা জাহরা (সালাঃ) তার (রাসূলের) ইন্তেকালের পরেও কমপক্ষে ৭৫ দিন জীবিত ছিলেন, তাছাড়াও রাসূল (সা.)-এর সহধর্মিনীগণ, যারা সম্পদের এক অষ্টাংশের অধিকারীনি ছিলেন, তারা সকলেরই জীবিত ছিলেন। যদি এ বিষয়গুলিকে উপেক্ষা করি তবুও আলী (আ.) রাসূল (সা.)-এর চাচাতো ভাই আর চাচাতো ভাই তৃতীয় পর্যায়ে গিয়ে উত্তরাধিকার পায় এবং আমরা জানি রাসূল (সা.)-এর চাচা আব্বাস তার (সা.) মৃত্যুর পরও জীবিত ছিলেন আর চাচা হচ্ছে দ্বিতীয় পর্যায়ের উত্তরাধিকারী বা ওয়ারিশ।

কিন্তু আহলে সুন্নাতের ফিকাহশাস্ত্র অনুযায়ী, স্ত্রীগণকে তাদের অংশ (১/৮) দেওয়ার পর সম্পদকে দুইভাগে ভাগ করা হয়ে থাকেঃ সে অনুযায়ী তার এক অংশ পাবে হযরত ফাতিমা জাহরা (সা.) যিনি রাসূল (সা.)-এর একমাত্র কন্যা ছিলেন। অপর অংশটি যেটা তার অংশের বাইরে, সেটা তার (সা.) চাচা আব্বাসের দিকে বর্তায়। সুতরাং, আমিরুল মু’মিনীন হযরত আলী (আ.) কোনভাবেই রাসূল (সা.)-এর সম্পদের উত্তরাধিকারী হতে পারেন না। অপরদিকে যেহেতু রাসূল (সা.) সরাসরি তাকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছেন, তাই অবশ্যই এই হাদীসে “এরস” বা উত্তরাধিকারের বিষয়টি সম্পদ ভিন্ন অন্যকিছুকে বুঝায়। স্বাভাবিকভাবেই এই হাদীসে উত্তরাধিকারের বিষয়টি রাসূল (সা.)-এর আধ্যাত্মিক ও সামাজিক মর্যাদার সাথে সংশ্লিষ্ট এবং আলী (আ.) রাসূল (সা.)-এর জ্ঞান ও সুন্নাতের উত্তরাধিকারী আর সেই দলিলের ভিত্তিতেই তিনি তার (সা.) খলিফা বা প্রতিনিধি।

রাসূল (সা.) আলীকে (আ.) বলেছেনঃ “তুমি আমার ভাই ও উত্তরাধিকারী”। আলী (আ.) বলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার কাছ থেকে উত্তরাধিকারী হিসেবে কি পাব? রাসূল (সা.) বললেনঃ “ঐ সকল জিনিস যা আমার পূর্ববর্তী নবীগণ উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে গেছেন।” জিজ্ঞেস করলেনঃ “তারাঁ কি জিনিস উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে গেছেন?” তিনি বললেনঃ আল্লাহর কিতাব ও নবীদের সুন্নাত।” আমিরুল মু’মিনীন আলী (আ.) নিজেও বলেছেনঃ আমি রাসূল (সা.)-এর জ্ঞানের উত্তরাধিকারী।

৪. মু’মিনদের পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে আলী

রাসূল (সা.) যখনই এমন কোন ব্যক্তির সাথে সাক্ষাত করতেন যে, আলীর (আ.) সাথে যে কারণেই হোক দ্বন্দ সৃষ্টি করেছে বা যদি কেউ মূর্খতার বশে আলী (আ.) সম্পর্কে কেউ রাসূল (সা.)-এর নিকট অভিযোগ করতো, তিনি তাদেরকে বলতেনঃ

ما تریدون من علی إنّ علیا منّی و أنا منه و هو ولیّ کل مؤمن بعدی

অর্থাৎ আলীর সম্পর্কে তোমরা কি বলতে চাও সে আমা হতে আর আমি তার থেকে। আমার পরে আলীই প্রত্যেক মু’মিনের ওয়ালী বা পৃষ্ঠপোষক (অভিভাবক)।

যদিও বাক্যে ব্যবহৃত “ওয়ালী” শব্দটির অনেকগুলো আভিধানিক অর্থ রয়েছে, তারপরেও এই হাদীসে নেতা, পৃষ্ঠপোষক বা অভিভাবক ব্যতীত অন্য কোন অর্থে ব্যবহার হয়নি; এই হাদীসে “আমার পরে” শব্দটিই উক্ত মতকে স্বীকৃতি প্রদান করে। কারণ, যদি “ওয়ালী” শব্দের উদ্দেশ্য বন্ধুত্ব , বন্ধু, সাথী, প্রতিবেশী, একই শপথ গ্রহণকারী, এ ধরনের অর্থই হত তাহলে “রাসূল (সা.)-এর পরে” যে সময়ের প্রতি বিশেষ ইঙ্গিত করা হয়েছে তার দরকার ছিল না, কারণ তার (সা.) জীবদ্দশায়ই তিনি (আলী) ঐরূপ ছিলেন।

৫. রাসূল (সা.)-এর বাণীতে আলীর (আ.) পৃষ্ঠপোষকতা বা অভিভাবকত্বকে মেনে নেওয়ার সুফলের কথা

যখনই সাহাবীগণ রাসূল (সা.)-এর পরে তার খলিফা বা প্রতিনিধি ও ইসলামী রাষ্ট্র নেতা সম্পর্কে তার (সা.) সাথে কথা বলতেন, তখনই তিনি (কোন কোন হাদীস অনুযায়ী দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন) আলীর (আ.) পৃষ্ঠপোষকতা বা অভিভাবকত্ব মেনে নেওয়ার সুফল সম্পর্কে বক্তব্য দিতেন।

তিনি বলতেনঃ

ان و لیتموها علیا وجدتموه هادیا مهدیا یسلک بکم علی الطریق المستقیم

অর্থাৎ যদি খেলাফতকে আলীর হাতে তুলে দাও, তাহলে দেখবে যে, হেদায়াত প্রাপ্ত ও হেদায়াতকারী হিসাবে সে তোমাদেরকে সঠিক পথে পরিচালনা করছে।

اما والذی نفسی بیده لئن اطاعوه لیدخلن الجنه اجمعین اکتعین

অর্থাৎ তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ আছে! যারা আলীর আনুগত্য করবে তারা সকলেই বেহেশতে প্রবেশ করবে।

ان تستخلفوا علیا و لا اراکم فاعلین تجدوه هادیا مهدیا یحملکم علی المحجه البیضا

 

অর্থাৎ যদি তোমরা আলীকে খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে মেনে নাও, তাহলে (আমার মনে হয় না তোমরা এমনটি করবে) দেখবে যে, সে সঠিক পথপ্রাপ্ত ও পথপ্রদর্শক, যে তোমাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে।

৬. আলী (আ.)-এর নির্ধারিত খেলাফত

ইতিপূর্বেও গাদীরের হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছি যে, আলীকে পরিচয় করানোর বিষয়টি আল্লাহর নির্দেশেই হয়েছিল; এখন এমন একটি হাদীস তুলে ধরব যা ঐ বিষয়টির সত্যতা প্রমাণ করবে।

রাসূল (সা.) হতে বর্ণিত আছে যে, শবে মেরাজে (ঊর্ধ্বগমনের রাতে) যখন আমি নৈকট্যের প্রান্ত সীমাতে পৌছালাম ও আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান হলাম, তিনি বললেনঃ হে মুহাম্মদ! আমি জবাব দিলামঃ লাব্বাইক (আমি হাজির)। তিনি বললেনঃ আপনি কি আমার বান্দাদেরকে পরীক্ষা করে দেখেছেন যে, তাদের মধ্যে কে সবচেয়ে বেশী আমার অনুগত?

আমি বললামঃ হে আল্লাহ তাদের মধ্যে আলীই সবচেয়ে বেশী অনুগত।

তিনি বললেনঃ আপনি সত্যই বলেছেন হে মুহাম্মদ! আপনি কি স্বীয় খলিফা বা প্রতিনিধি নির্ধারণ করেছেন যে আপনার পরে আপনার দায়িত্বগুলি পালন করবে ও আমার বান্দাদেরকে যারা কোরআন সম্পর্কে জানে না তাদেরকে শিক্ষা দিবে?

আমি বললামঃ হে আল্লাহ! আপনি নিজেই আমার জন্য প্রতিনিধি নির্ধারণ করে দিন।

বললেনঃ আমি আলীকে আপনার প্রতিনিধি হিসেবে নির্ধারণ করলাম; তাকে আপনি স্বীয় প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন করুন।

একইভাবে তিনি বলেছেনঃ আল্লাহ প্রত্যেক জাতির জন্য নবী নির্বাচন করেছেন ও প্রত্যেক নবীর জন্য নির্ধারণ করেছেন তার প্রতিনিধি। আমি হলাম এই জাতির নবী আর আলী হচ্ছে আমার ভারপ্রাপ্ত বা ওসী।

(মুহাম্মদ রেজা জাব্বারান প্রণীত ও মুহাদ্দিস এম, এ, রহমান কর্তৃক অনূদীত আহলে সুন্নাতের দৃষ্টিতে গাদীর গ্রন্থ থেকে সংকলিত)


source : alhassanain
user comment
 

latest article

  সূরা আত তাওবা; (১৮তম পর্ব)
  হযরত ফাতেমা যাহরা (সা. আ.) এর অমিয় বাণী
  আধ্যাত্মিক পথ পরিক্রমায় ক্রন্দনের ...
  আবতার কে বা কা’রা?
  রেজা (আ.) এর মাজারে কানাডীয় যুবকের ইসলাম ...
  ইসলামী দর্শন
  আল্লাহ সর্বশক্তিমান
  কারবালার চেতনা কি বিলুপ্তির পথে?
  কারবালায় ৬০টি দেশের যায়েরদের উপস্থিতি
  মামুন ইমাম রেজা(আ)কে শহীদ করলেও আসল ...