বাঙ্গালী
Thursday 29th of June 2017
code: 80940
সূরা আত তাওবা; (২৫তম পর্ব)



সূরা আত তাওবা; আয়াত ১০৮-১১২

সূরা তাওবার ১০৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-

لَا تَقُمْ فِيهِ أَبَدًا لَمَسْجِدٌ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَى مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ أَحَقُّ أَنْ تَقُومَ فِيهِ فِيهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَنْ يَتَطَهَّرُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَّهِّرِينَ

“হে নবী, কখনও জারার মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য দণ্ডায়মান হবেন না। যে মসজিদের ভিত্তি প্রথম থেকে ধর্ম অনুষ্ঠানের জন্য স্থাপিত ও খোদাভীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার মধ্যেই নামাজে দাঁড়ানো সমুচিত ও শ্রেয়। ওই মসজিদে পবিত্র হতে চায় এমন অনেক লোক আছে এবং যারা পবিত্র হয় আল্লাহ তাদের পছন্দ করেন। আল্লাহ পবিত্র লোকদের ভালোবাসেন।” (৯:১০৮)

গত পর্বে বলা হয়েছে, মদীনার মোনাফিকরা তাদের ততপরতা চালানোর জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিল। মহান আল্লাহর নির্দেশে মহানবী (সা.) ওই মসজিদ ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। এ আয়াতে আল্লাহ মহানবী ও মুমিনদের সম্বোধন করে বলেছেন, খোদাভীতির কারণে যে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে সে মসজিদই প্রকৃত মসজিদ। যে মসজিদ বিভেদ সৃষ্টির জন্য ও ষড়যন্ত্র করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সে মসজিদের কোনো মূল্য নেই। এ আয়াতের পরবর্তী অংশে ইসলামের প্রথম মসজিদের কথা বলা হয়েছে। রাসূল (সা.) মক্কা থেকে মদীনায় হিযরত করার সময় কুবা অঞ্চলে ওই মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি যতদিন মদীনায় ছিলেন ততদিন প্রতি সপ্তাহে ওই মসজিদে একবার নামাজ আদায় করতেন।

এ আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে-

এক. রাজনীতি ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। মসজিদে নামাজ পড়া উত্তম, তবে সেসব মসজিদে নয় যেসব মসজিদ ইসলামের শক্র বা বিরোধীরা প্রতিষ্ঠা করেছে।

দুই. কোনো মসজিদের বাহ্যিক সৌন্দর্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, বরং মসজিদে খোদাভীরু ও পবিত্র মনের নামাজীরা নামাজ পড়তে আসেন কিনা- সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

সূরা তওবার ১০৯ ও ১১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

أَفَمَنْ أَسَّسَ بُنْيَانَهُ عَلَى تَقْوَى مِنَ اللَّهِ وَرِضْوَانٍ خَيْرٌ أَمْ مَنْ أَسَّسَ بُنْيَانَهُ عَلَى شَفَا جُرُفٍ هَارٍ فَانْهَارَ بِهِ فِي نَارِ جَهَنَّمَ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ (109) لَا يَزَالُ بُنْيَانُهُمُ الَّذِي بَنَوْا رِيبَةً فِي قُلُوبِهِمْ إِلَّا أَنْ تَقَطَّعَ قُلُوبُهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

“যে ব্যক্তি পবিত্রতা বা খোদাভীতি ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজ ঘরের ভিত্তি স্থাপন করে, সে উত্তম-নাকি যে পতনমুখী গর্তের কিনারায় নিজ ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেছে সেই উত্তম- যা তাকে ওই ঘরসহ জাহান্নামের আগুনে ফেলে দেয়? আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে ভালোবাসেন না।” (৯:১০৯)

“মোনাফিকরা যে ঘর নির্মাণ করেছে, সে সম্পর্কে তাদের মনে সব সময় হতাশা বা সন্দেহ থাকবে যতক্ষণ না মৃত্যু অথবা তাওবার মাধ্যমে তার অবসান ঘটে। আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময়।” (৯:১১০)

আগের আয়াতে মুনাফিকরা জারার মসজিদের তুলনায় মুমিনদের নির্মিত কুবা মসজিদের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরার পর এ আয়াতে ওই দুই মসজিদের নির্মাতাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তুলনামূলক মন্তব্য করা হয়েছে। মানুষের বাহ্যিক দিক গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং কাজের উদ্দেশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে মানুষের উপকার করেন। কিন্তু তারা এ ধরনের কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির  উদ্দেশ্যে করেন না বলে আল্লাহর কাছে এর কোনো প্রতিদান পাবেন না। বরং এ ধরনের লোক দেখানো ভালো কাজের জন্যে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এ ধরনের কাজ করা শুন্যে বা গর্তের কিনারায় কিছু নির্মাণ করার সমতূল্য যা ধসে গিয়ে নির্মাণকারীর মৃত্যু ঘটায়।

এ আয়াত থেকে মনে রাখা দরকারঃ

এক. মানুষের কাজের মূল্য তার উদ্দেশ্য বা নিয়তের ওপর নির্ভরশীল, কাজের বাহ্যিক অবস্থার ওপর নয়।

দুই. অনেক মসজিদের নির্মাতা দোযখে নিক্ষিপ্ত হবেন। কারণ তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নয় বরং নিজ স্বার্থ পূরণের জন্যে মসজিদ নির্মাণ করেছেন।

তিন. মুনাফিকদের চিন্তাধারার রূপকাররা সব সময়ই হতাশাগ্রস্ত, হতভম্ব ও নিজ কাজের সাফল্যের ব্যাপারে সন্দিহান।

সূরা তাওবার ১১১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

إِنَّ اللَّهَ اشْتَرَى مِنَ الْمُؤْمِنِينَ أَنْفُسَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ بِأَنَّ لَهُمُ الْجَنَّةَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَيَقْتُلُونَ وَيُقْتَلُونَ وَعْدًا عَلَيْهِ حَقًّا فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ وَالْقُرْآَنِ وَمَنْ أَوْفَى بِعَهْدِهِ مِنَ اللَّهِ فَاسْتَبْشِرُوا بِبَيْعِكُمُ الَّذِي بَايَعْتُمْ بِهِ وَذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

"নিশ্চয়ই আল্লাহ বেহেশতের বিনিময়ে মুমিনদের জীবন ও সম্পদ কিনে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে শক্রদেরকে হত্যা করে এবং নিজেও নিহত হয়। এটাই তাওরাত ও ইঞ্জিলে এবং পবিত্র কুরআনে আল্লাহর দেয়া ওয়াদা হিসেবে বর্ণিত হয়েছে এবং অঙ্গীকার পালনে আল্লাহর চেয়ে কে বেশি বিশ্বস্ত? তাই আল্লাহর সাথে তোমাদের যে কেনা-বেচা হয়েছে, সেজন্য আনন্দিত হও এবং এটাই বড় সাফল্য।" (৯:১১১)

পবিত্র কুরআনের সংস্কৃতিতে দুনিয়া হলো একটি বাজার এবং মানুষ এখানে বিক্রেতা। এই বাজারের পণ্য হলো জীবন ও সম্পদ, আর সর্বশক্তিমান আল্লাহই হলেন এসব পণ্যের ক্রেতা। সব পণ্যের মূল্য হলো জান্নাত। আল্লাহর কাছে জীবন বিক্রির ব্যবসা মুনাফা বা লাভে পরিপূর্ণ। তাই আমাদের উচিত নিজেকে আল্লাহর কাছে বিক্রি করে দেয়া। কারণ, আমাদের জীবনটা তাঁরই দান। আর মহান আল্লাহ তারই জিনিস আমাদের কাছে থেকে সবচেয়ে বেশি দাম দিয়ে কিনে থাকেন।

এ আয়াত থেকে আমাদের মনে রাখা দরকারঃ

এক.  জান্নাত লাভের অন্যতম পন্থা হল আল্লাহর পথে জিহাদ করা। অবশ্য জীবন দিয়ে জিহাদ করা- সম্পদ দিয়ে জিহাদ করার চেয়ে বেশি মূলবান ও মর্যাদাপূর্ণ।

দুই.  আল্লাহর পথে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে জীবিত থাকলাম, না মরে গেলাম-তা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়।

তিন.  আল্লাহর কাছে আমাদের কোনো পাওনা নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও মহান ও দয়াময় আল্লাহ আমাদের জন্যে পুরস্কার নির্ধারণ করেছেন।

সূরা তাওবার ১১২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

التَّائِبُونَ الْعَابِدُونَ الْحَامِدُونَ السَّائِحُونَ الرَّاكِعُونَ السَّاجِدُونَ الْآَمِرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّاهُونَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَالْحَافِظُونَ لِحُدُودِ اللَّهِ وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ

"যারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে তারা ক্ষমাপ্রার্থী, উপাসনাকারী, প্রশংসাকারী, রোজাদার, রুকুকারী, সেজদাকারী, সতকাজের আদেশ ও অসতকাজে নিষেধ করে। তারা আল্লাহর নির্ধারিত সীমাগুলো সংরক্ষণ করে, এইসব বিশ্বাসীদের সুসংবাদ দাও।" (৯:১১২)

আগের আয়াতে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করার জন্যে মুমিনদের প্রস্তত থাকার কথা বলা হয়েছে। এ আয়াতে মুমিন মুজাহিদদের নয়টি গুণের কথা বলা হয়েছে যাতে কেউ এটা মনে না করেন যে, বিশ্বাসীরা শুধু জিহাদ ও তরবারিকে পছন্দ করেন। বরং বিশ্বাসী হবার জন্যে তাদেরকে আরো অনেক গুণ বা পূর্ণতা অর্জন করতে হয়। ধর্মীয়, সামাজিক ও ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালনও ঈমানের অপরিহার্য অংশ।

নামাজ, রোজা, যিকির, দোয়া ও এবাদাতের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর দাসত্ব করে। এ বিষয়গুলো মানুষের আত্মগঠন বা প্রশিক্ষণের মাধ্যম। এ ধরনের ইবাদাত মানুষকে স্বার্থপরতা, আত্মপূজা থেকে দূরে রাখে। আর এ অবস্থায় তারা যখন জিহাদের অস্ত্র ধারণ করে তখন তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যেই করে, নিজের স্বার্থের জন্যে বা নিজের অভিরুচি পূরণের জন্য নয়। সতকাজ করার মাধ্যমে সমাজের সংস্কার করা ও মানুষকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রেখে তাদেরকে সংশোধন করার ব্যাপারে নিবেদিতপ্রাণ হওয়াটাও প্রকৃত মুমিনদের অন্যতম দায়িত্ব।

এ আয়াতে আমাদের জন্য দু'টি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে-

এক. আত্মগঠন হলো বড় বা শ্রেষ্ঠ জিহাদ এবং শক্রদের সাথে জিহাদ হল ছোট জিহাদ। তাই শেষোক্তটির চেয়ে প্রথমোক্তটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দুই. মুমিনরা একদিকে যেমন অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অন্যায়ের সাথে সংগ্রাম করেন তেমনি তারা বাইরের শক্রর সাথেও সংগ্রাম করেন যাতে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা বা আইনগুলো রক্ষিত হয় এবং তার আইন প্রতিষ্ঠিত হয়।

user comment
 

latest article

  সূরা ইউনুস;(১৬তম পর্ব)
  সূরা ইউনুস;(১৮তম পর্ব)
  বিভিন্ন ফিকাহর দৃষ্টিতে যাকাতুল ফিতর
  সূরা ইউনুস;(৩য় পর্ব)
  অবিকৃত গ্রন্থ আল-কোরআন
  উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা (আ.)
  নাহজুল বালাগায় ‘যুহ্দ’
  হযরত আলীর (আ.) মর্যাদা ও গুনাবলী
  হযরত আলীর বীরত্ব ও সাহসিকতা
  হযরত আলী (আ.)-এর শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে ...