বাঙ্গালী
Monday 4th of March 2024
0
نفر 0

সূরা আত তাওবা;(৬ষ্ঠ পর্ব)



সূরা আত তাওবা; আয়াত ২৩-২৭

সূরা তাওবার ২৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا آَبَاءَكُمْ وَإِخْوَانَكُمْ أَوْلِيَاءَ إِنِ اسْتَحَبُّوا الْكُفْرَ عَلَى الْإِيمَانِ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

“হে ঈমানদারগণ, তোমাদের পিতা বা ভাইয়েরা যদি ঈমানের ওপর কুফরকে প্রাধান্য দেয় তবে তাদেরকে অভিভাবক  হিসেবে গ্রহণ কর না আর তোমাদের মধ্যে যারা তাদের অভিভাবকরূপে গ্রহণ করবে তারা সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভূক্ত হবে।” (৯:২৩)

সূরা তাওবার পূর্ববর্তী আয়াতগুলোতে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও হিজরতের প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করা হয়েছে। এ আয়াতে বলা হচ্ছে, যদি তোমাদের মাতা-পিতা অমুসলমান অথবা জিহাদ ও হিজরতে বিশ্বাসী না হয়, তবে তাদের কারণে আল্লাহর ধর্ম ত্যাগ করো না এবং পারিবারিক সম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে আল্লাহ ও তার রাসূলের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ কর না বরং এ রকম পরিস্থিতিতে পিতা বা ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করলে আল্লাহর কাছে তোমরা সীমালংঘনকারী হিসেবে পরিগণিত হবে।

এ আয়াত থেকে আমরা যে বিষয়গুলো শিখতে পারি তা হচ্ছে, ধর্ম ও ধর্মীয় বিশ্বাস অক্ষুন্ন রাখার স্বার্থে কখনো কখনো পরিবারকে ত্যাগ করতে হয়। এ ছাড়া, সন্তানের প্রতি পিতার নির্দেশ ততক্ষণ পর্যন্ত কার্যকরী থাকবে যতক্ষণ ওই নির্দেশ আল্লাহর আদেশের পরিপন্থী না হবে।

সূরা তাওবার ২৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

قُلْ إِنْ كَانَ آَبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ وَإِخْوَانُكُمْ وَأَزْوَاجُكُمْ وَعَشِيرَتُكُمْ وَأَمْوَالٌ اقْتَرَفْتُمُوهَا وَتِجَارَةٌ تَخْشَوْنَ كَسَادَهَا وَمَسَاكِنُ تَرْضَوْنَهَا أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ

“হে নবী! আপনি মুমিনদের বলুন, তোমাদের কাছে যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় কর এবং তোমাদের বাসস্থান-যাকে তোমরা পছন্দ কর তা যদি আল্লাহ, তার রাসূল ও তার রাস্তায় জিহাদ করার চেয়ে বেশি প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত। আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে সতপথ প্রদর্শন করেন না।” (৯:২৪)

আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এ আয়াতে বলা হচ্ছে, তোমাদের ঈমানকে তোমরা পরীক্ষা করে দেখ, কোন্‌ জিনিস তোমাদের কাছে অধিক প্রিয়? আল্লাহ, তার রাসূল ও তার পথে জিহাদ বেশি প্রিয়? নাকি পিতা, মাতা, পত্নী, সন্তান, ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা চাকরি বেশি প্রিয়? যদি তোমরা ধর্মের চেয়ে পৃথিবীর জীবনকে প্রাধান্য দাও তবে এ পৃথিবীতে এবং পরকালে তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে খারাপ পরিণতি। সে ক্ষেত্রে এ পৃথিবীতে আল্লাহর হেদায়েত থেকে বঞ্চিত এবং পরকালে জাহান্নামের কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হবে।

এ আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে-

প্রথমত : আল্লাহর নির্দেশ ও নিজের ইচ্ছাকে পাশাপাশি রাখলে ঈমানের পরীক্ষা হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত : এ পৃথিবীতে জীবনে সুখ স্বাচ্ছন্দের প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু তা যেন ধর্মচ্যুতি এবং আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার মাধ্যমে না হয়।

তৃতীয়ত : ভালোবাসা ও আবেগ যেন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে বরং প্রয়োজনে জান-মাল, স্ত্রী ও সন্তানদেরকে আল্লাহর রাস্তায় উতসর্গ করতে হবে।

সূরা তাওবার ২৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

لَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ فِي مَوَاطِنَ كَثِيرَةٍ وَيَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنْكُمْ شَيْئًا وَضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُمْ مُدْبِرِينَ

“আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন অনেক ক্ষেত্রে এবং হুনাইন যুদ্ধের দিনে যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদের প্রফুল্ল করেছিল। কিন্তু তা তোমাদের কাজে আসেনি এবং পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের জন্য তা সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে।” (৯:২৫)

আগের আয়াতে জিহাদের নির্দেশ অমান্য করার ব্যাপারে কথা বলার পর জিহাদের অনুপ্রেরণা সৃষ্টির জন্য এ আয়াতে হুনাইনের যুদ্ধে আল্লাহর সাহায্যের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের পর মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তায়েফ এলাকার একটি গোত্রের ষড়যন্ত্র ও তাদের হামলা প্রতিহত করার জন্য একদল মুসলমানকে ওই এলাকায় পাঠান। কিন্তু মুসলমানরা শত্রুদের সাথে যুদ্ধে পর্যুদস্ত হয় এবং তাদের একটা বড় অংশ জিহাদের ময়দান থেকে পালিয়ে যায়। মহানবী পলায়নকারীদের পুনরায় জিহাদে যাওয়ার আহবান জানান এবং দ্বিতীয়বারের যুদ্ধে মুসলমানরা বিজয়ী হয়। তাদের হাতে বন্দী হয় বহু শত্রুসেনা এবং প্রচুর গণিমতের মাল তাদের হস্তগত হয়।

এ আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারি, সৈন্যসংখ্যা দ্বারা যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় না বরং ঈমান বা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস এবং আল্লাহর সাহায্যের ওপর সবকিছু নির্ভর করে। এ ছাড়া, কখনো কখনো স্বপক্ষের সৈন্য সংখ্যার আধিক্য নিজেদের মধ্যে অহংকার ও উদাসিনতা সৃষ্টি করে, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে যুদ্ধে পরাজিত ও অপদস্থ হতে হয়। তাই এ আয়াতে মুমিনদেরকে নিজেদের সংখ্যার দিকে না তাকিয়ে আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে বলা হয়েছে।

সূরা তাওবার ২৬ ও ২৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

ثُمَّ أَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَى رَسُولِهِ وَعَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَأَنْزَلَ جُنُودًا لَمْ تَرَوْهَا وَعَذَّبَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَذَلِكَ جَزَاءُ الْكَافِرِينَ (26) ثُمَّ يَتُوبُ اللَّهُ مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ

“এরপর আল্লাহ তার পক্ষ থেকে সান্ত্বনা নাযিল করেন তার রাসূল ও মুমিনদের প্রতি এবং অবতীর্ণ করেন এমন সেনাবাহিনী যাদের তোমরা দেখতে পাওনি। আর শাস্তি প্রদান করেন কাফেরদের এবং এটি হলো কাফেরদের কর্মফল।” (৯:২৬)

“এরপর আল্লাহ যাদের প্রতি ইচ্ছা তাওবা করার তাওফীক দেন। আর  আল্লাহর অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”  (৯:২৭)

আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এ আয়াতে বলা হচ্ছে, তোমরা তোমাদের বিশাল সৈন্যবাহিনী দেখে আত্মতুষ্টিতে ভুগছিলে। অথচ যুদ্ধ শুরু হলে শত্রুপক্ষের হামলা প্রতিহত করতে না পেরে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মহান আল্লাহ তার রাসূলকে সাহায্য এবং তাকে রক্ষা করার জন্য মানুষরূপী ফেরেশতা পাঠান। অন্যদিকে, মুমিনদেরকে ফিরে এসে শত্রুসেনাকে পরাস্ত করার জন্য তাদের অন্তরে প্রশান্তি ও সাহসিকতা দান করেন। তবে যারা তাওবা করে ফিরে এসেছে আল্লাহ কেবল তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন।

এ আয়াত থেকে শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, আত্মবিশ্বাস, প্রশান্তি ও দৃঢ় মনোবল যুদ্ধ জয়ের নিয়ামক শক্তি যা কেবল আল্লাহর প্রতি ঈমানের মাধ্যমে অর্জন করা যায়। এ ছাড়া তাওবার দরজা মানুষের জন্য সব সময়ের জন্য খোলা রয়েছে এবং মহান আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালোবাসেন।

0
0% (نفر 0)
 
نظر شما در مورد این مطلب ؟
 
امتیاز شما به این مطلب ؟
اشتراک گذاری در شبکه های اجتماعی:

latest article

মিথ্যা কথা বলা
নামাজ : আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের ...
আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়
শাফায়াত
শিয়া-সূন্নীর মধ্যে পার্থক্য কি?
আফ্রিকান নও মুসলিম রুজে বুনগুস
সূরা আত তাওবা; (১৯তম পর্ব)
শিয়া মুসলমানরা কত ওয়াক্ত নামাজ ...
সূরা আত তাওবা;(৬ষ্ঠ পর্ব)
সৃষ্টিকর্তার গুণাবলী

 
user comment