বাঙ্গালী
Thursday 30th of November 2023
0
نفر 0

ইসলাম জ্ঞানগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত

ইসলাম জ্ঞানগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত

“আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিন ও রাতের পরিবর্তনে, সমুদ্রে বিচরণশীল জলযানসমূহে যা মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত, আকাশ থেকে আল্লাহ্ যে বারি বর্ষণ করেন যার মাধ্যমে ভূ-পৃষ্ঠকে তার মৃত্যুর পর আবার পুনর্জীবিত করেন তাতে এবং তার মধ্যে যাবতীয় জীবজন্তুর বিস্তারে, বায়ুর দিক পরিবর্তনে, আকাশ ও পৃথিবীর মাঝে অবস্থিত নিয়ন্ত্রিত মেঘমালাতে বুদ্ধিমান জাতির জন্য নিদর্শন রয়েছে।”-(সূরা বাকারা : ১৬৪)      পবিত্র কোরআনের উপরোক্ত আয়াতটিতে প্রকৃতির অনেক নিদর্শনের কথা বর্ণিত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই কোরআন এ ধরনের নিদর্শনের বর্ণনা দিয়ে মহান আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্বের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিশেষ করে এ ধরনের আয়াতগুলোতে সমগ্র জগৎ জুড়ে যে বিস্ময়কর শৃঙ্খলা, ঐক্য ও সামঞ্জস্য রয়েছে তা সুস্পষ্টরূপে ফুটে উঠেছে। আর এ সব কিছুই বর্ণিত হয়েছে মহান প্রতিপালক ও তাঁর বিশেষ কয়েকটি গুণের নিদর্শন হিসেবে যা আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণস্বরূপ উপস্থাপন করা হয়েছে। এ ধরনের উপস্থাপনা নিঃসন্দেহে বুদ্ধিবৃত্তিক।

এভাবে পবিত্র কোরআন ও নির্ভুল হাদীসসমূহের দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে ইসলাম জ্ঞানগত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসগুলোসহ অন্য শাখা-প্রশাখামূলক বিধি-বিধানও দলিল-প্রমাণ সহকারে বর্ণিত হয়েছে; এমন কি যারা আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করতে অস্বীকার করে তাদেরকেও কোরআন সপক্ষের যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপনের আহ্বান জানায়। তাই ক্রমাগতভাবে বলা হয়েছে, “বল, যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে প্রমাণ পেশ কর।”-(সূরা বাকারা : ১১১, আম্বিয়া : ২৪, কেছাছ : ৭৫, নামল : ৬৪)

ইসলাম যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও জ্ঞানগত ধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত পবিত্র কোরআন তার সুস্পষ্ট সাক্ষ্য বহন করে। গণনা করে দেখা গেছে, ‘জ্ঞান’ (علم) শব্দটি কোরআনে মোট প্রায় ৭৮০ বার, ‘বুদ্ধিবৃত্তি’ (عقل) শব্দটি মোট ৪৮ বার ও ‘চিন্তা’ (فکر) শব্দটি মোট ১৮ বার ব্যবহৃত হয়েছে। আর পবিত্র কোরআন আগাগোড়াই বিভিন্ন দার্শনিক যুক্তিতে পরিপূর্ণ যা ইতোপূর্বে কোন দার্শনিকই উল্লেখ করেন নি এবং পরবর্তীতেও কোন চিন্তাবিদ তা খণ্ডন করতে পারেন নি। বুদ্ধিবৃত্তিক এসব আয়াত অত্যন্ত সূক্ষ্ম যুক্তি ও গভীর জ্ঞানগত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত- যা অস্বীকার করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ নিম্নোক্ত আয়াত দু’টি প্রণিধানযোগ্য :       ১. “ওরা কি স্রষ্টা ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে, না ওরা নিজেরাই স্রষ্টা? ওরা কি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে?”-(সূরা তূর : ৩৫ ও ৩৬)

২. “যদি এ দু’য়ের (আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর) মধ্যে আল্লাহ্ ছাড়া বহু ইলাহ্ থাকত তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত। সুতরাং তারা যা বলে তা থেকে আরশের অধিপতি আল্লাহ্ পবিত্র।”- (সূরা আম্বিয়া : ২২)

কোরআনের পাশাপাশি আমরা যদি হাদীস গ্রন্থগুলোর দিকে দৃষ্টি দিই তাহলেও একই দৃশ্য দেখতে পাব। সেখানেও যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির প্রাধান্য। প্রকৃতপক্ষে ইসলাম অযৌক্তিকভাবে কোন কিছু চাপিয়ে দেয় না, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক পন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়।

অবশ্য জ্ঞানগত পন্থা অবলম্বনের ক্ষেত্রে খ্রিস্টীয় জগৎ সংশয়ের সৃষ্টি করেছে। দীনের ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক এ স্পিরিটকে তারা মেনে নেয় নি, বরং দীনকে বোঝার ক্ষেত্রে মানুষের মনের অনুভূতিকেই তারা একমাত্র ভিত্তি মনে করে। যুক্তি ও বুদ্ধিকে তারা এ ক্ষেত্রে অগ্রাহ্য করে। তাই তথাকথিত ত্রিত্ববাদ যা বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তিতে অসার প্রমাণিত হয়েছে, তার সপক্ষে তারা বলে, ত্রিত্ববাদকে হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করতে হবে, বুদ্ধি দিয়ে নয়। কারণ দীনের পথ অনুভূতির পথ, যুক্তির পথ নয়। মোট কথা, দীন যে জ্ঞানগত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত তা তারা অস্বীকার করে। অবশ্য হৃদয়ের অনুভূতির সঠিক মূল্যায়ন ইসলামও করেছে, এমন কি বলা হয়েছে ‘আল্লাহর প্রতি ভালবাসা’ই হচ্ছে ইসলামের সঠিক সংজ্ঞা। কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তির সাথে মনের অনুভূতির কোন বৈপরীত্য আছে বলে ইসলাম মনে করে না; বরং একটিকে আরেকটির পরিপূরক হিসেবে গণ্য করে।

বস্তুবাদীরা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার বাইরে যে কোন বিষয়ের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে। বস্তুজগতের ঊর্ধ্বে কোন কিছুর অস্তিত্বে বিশ্বাস করাকে তারা বুদ্ধিবৃত্তির পরিপন্থী বলে মনে করে। তাই তাদের জ্ঞানগত আলোচনা বস্তুজগতেই সীমাবদ্ধ থাকে। মহান দার্শনিকদের প্রজ্ঞাময় বক্তব্য তারা উপেক্ষা করে, অথচ তারা যদি সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ এ প্রকৃতির দিকে একবার গভীর দৃষ্টি দিয়ে তাকাত, আর যদি নীল মহাশূন্যের বিস্তৃত ও সুবিন্যস্ত উজ্জ্বল তারকারাজিকে সত্যিকার বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টি নিয়ে দেখত, তাহলে নিঃসন্দেহে অনুধাবন করত এ সব কিছুর উৎস কোথায় এবং চমৎকার এ সব নিদর্শনের পেছনে কোন্ মহাশক্তির অস্তিত্ব রয়েছে!

মহান আল্লাহ্ মানব জাতির পথপ্রদর্শক হিসেবে দু’ধরনের নিদর্শন (حجة) দান করেছেন। একটি হচ্ছে বুদ্ধিবৃত্তি যা মানুষকে নিজের অস্তিত্বের ভেতর থেকে তাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করে। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে সম্মানিত নবীগণ যাঁরা বাইরে থেকে তাকে সত্য পথের দিকে আহ্বান জানান। নিদর্শন হিসেবেও এ দু’টি একটি আরেকটির পরিপূরক অর্থাৎ যদি আমরা শুধু বুদ্ধিবৃত্তির মালিক হতাম, অথচ নবীদের আগমন না ঘটত অথবা এর বিপরীতটি হতো, উভয় ক্ষেত্রেই মানুষ পূর্ণাঙ্গ সফলতা অর্জন করতে পারত না।

পরিশেষে মহান প্রতিপালকের দরবারে প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করার মাধ্যমে আমাদেরকে সরল-সঠিক পথ বেছে নেয়ার তৌফিক দান করেন। আমিন!#আল-হাসানাইন

0
0% (نفر 0)
 
نظر شما در مورد این مطلب ؟
 
امتیاز شما به این مطلب ؟
اشتراک گذاری در شبکه های اجتماعی:

latest article

হযরত মুসা (আ.)'র মু'জিজার কাছে ...
সূরা ইউনুস;(৮ম পর্ব)
জ্ঞান অর্জনের দায়িত্ব-কর্তব্য (২য় ...
ইয়াযীদের দরবারে ইমাম সাজ্জাদ (আ.)
মহান আশুরা: শোক যখন শিল্প ও শক্তি
হযরত ফাতেমার চরিত্র ও কর্ম-পদ্ধতি
নূরনবী মোস্তফা (সাঃ) ( ৩৯তম পর্ব
হিন্দুর তৈরি খাবার খাওয়া যাবে ...
মহানবী (স.) হতে বর্ণিত ৪০টি হাদীস (২)
আল্লাহ্ ব্যতীত কেউ কি অদৃশ্যের ...

 
user comment